উত্তর-পশ্চিম নাইজেরিয়ায় অ্যামেরিকার সামরিক বাহিনীর সাম্প্রতিক বিমান হামলা ঘিরে দেশটির ভেতরে ও বাইরে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, এই হামলার লক্ষ্য ছিল সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইসিস, যারা প্রধানত খ্রিস্টানদের লক্ষ্য করে সহিংসতা চালিয়ে আসছে। তবে নাইজেরিয়ান নিরাপত্তা বিশ্লেষক, স্থানীয় ধর্মীয় নেতা এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই দাবির সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার বড় ধরনের ফারাক রয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাতে নাইজেরিয়ার সোকোটো স্টেইট–এ ১২টির বেশি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, উত্তর-পশ্চিম নাইজেরিয়ায় আইসিস-সংশ্লিষ্ট জঙ্গিদের লক্ষ্য করেই এই হামলা চালানো হয়েছে। তবে নাইজেরিয়া সরকার জানিয়েছে, হামলায় কোনো নির্দিষ্ট ধর্মকে লক্ষ্য করা হয়নি, যদিও তারা অভিযানে সম্মতি দিয়েছিল।
নাইজেরিয়ার নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও যুদ্ধ অভিজ্ঞ আওয়াল আবদুল্লাহি অ্যামেরিকার দাবিকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন, যদি অ্যামেরিকা সত্যিই আইসিস-সংশ্লিষ্ট জঙ্গিদের লক্ষ্য করতে চাইত, তাহলে তাদের নজর দেওয়া উচিত ছিল নাইজেরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সামবিসা অরণ্যে, যেখানে আইসিস ওয়েস্ট আফ্রিকা প্রভিন্স বা আইএস-ওয়াপ সক্রিয় রয়েছে।
আবদুল্লাহি আরো বলেন, সোকোটোতে কোনো আইসিস কার্যক্রম নেই। আইসিস বলতে হলে উত্তর-পূর্ব নাইজেরিয়ার কথা বলতে হবে, যেখানে আইএস-ওয়াপ রয়েছে।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, সোকোটো ও আশপাশের এলাকায় মূলত দুটি ধরনের সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয়—প্রথমত, লাকু-রাওয়া নামের একটি গোষ্ঠী, যারা সাহেল অঞ্চল থেকে এসে এখানে ঘাঁটি গেড়েছে। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন ডাকাত ও সশস্ত্র অপরাধী দল। নিরাপত্তা বিশ্লেষকের মতে, লাকু-রাওয়া গোষ্ঠী কিছু এলাকায় স্থানীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করলেও তাদের সরাসরি আইসিস বলা সমস্যাজনক।
লাকু-রাওয়াদের নির্মূল করার উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও ডাকাতদের আইসিস বলা প্রধান সমস্যা বলেও মনে করেন আবদুল্লাহি।
অ্যামেরিকার পক্ষ থেকে উত্তর-পশ্চিম নাইজেরিয়ায় খ্রিস্টান নিপীড়নের যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তা নিয়েও আবদুল্লাহি প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, সোকোটো বা পুরো উত্তর-পশ্চিম নাইজেরিয়ায় খ্রিস্টান গণহত্যা হচ্ছে—এই দাবি অত্যন্ত বিতর্কিত এবং এতে অনেক প্রশ্ন রয়েছে।
তার মতে, নাইজেরিয়ার মধ্যাঞ্চলের প্লাটো ও বেনুয়ে স্টেইটের মতো এলাকায় যেসব সহিংসতা হচ্ছে, তার বড় অংশ গোত্রীয় ও জাতিগত সংঘাত—বিশেষ কোরে পশুপালক ও কৃষকদের মধ্যে—যাকে অনেক সময় ভুলভাবে ধর্মীয় সহিংসতা হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
নাইজেরিয়া সরকার ডনাল্ড ট্রাম্পের “খ্রিস্টান গণহত্যা” সংক্রান্ত বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে তারা স্বীকার করেছে যে, দেশের উত্তরাঞ্চলে নানা সশস্ত্র গোষ্ঠীর কারণে গুরুতর নিরাপত্তা সমস্যা রয়েছে।
নাইজেরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউসুফ তুগ্গার বলেন, তারা একটি বড় সন্ত্রাসী হুমকির মুখে আছেন। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
অ্যামেরিকার ডিফেন্স ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে আলোচনার পর নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বোলা আহমেদ তিনুবু এই অভিযানে সম্মতি দেন। নাইজেরিয়া সরকার জানিয়েছে, তারা গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে অভিযানে সহায়তা করেছে।
একজন অ্যামেরিকান প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা জানান, হামলাটি নেইভি যুদ্ধজাহাজ থেকে নিক্ষেপ করা টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে চালানো হয়। দুর্গম এলাকা হওয়ায় নাইজেরিয়ার স্থলবাহিনীর পক্ষে সেখানে পৌঁছানো কঠিন ছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ডিফেন্স সেক্রেটারি পিট হেগসেথ বলেন, এটি এখানেই শেষ নয়—আরও হামলা হতে পারে।
নাইজেরিয়া আফ্রিকার অন্যতম জনবহুল দেশ এবং ধর্মীয়ভাবে অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুযায়ী: মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫০–৫৬% মুসলিম, প্রায় ৪৩–৪৮% খ্রিস্টান; এবং অল্পসংখ্যক মানুষ ঐতিহ্যবাহী আফ্রিকান ধর্ম বা ধর্মহীন পরিচয়ে অন্তর্ভুক্ত।
উত্তরাঞ্চল মুসলিম-প্রধান, আর দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলে খ্রিস্টান জনসংখ্যা তুলনামূলক বেশি। সোকোটো স্টেইট নাইজেরিয়ার মুসলিম জনগোষ্ঠীর অন্যতম ধর্মীয় কেন্দ্র এবং এখানেই বসবাস করেন সোকোটোর সুলতান। তিনি দেশটির মুসলিমদের আধ্যাত্মিক নেতা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নাইজেরিয়ায় চলমান সহিংসতা মূলত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ভৌগোলিক ও নিরাপত্তাজনিত—এবং মুসলিম ও খ্রিস্টান উভয় সম্প্রদায়ই এর শিকার।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, নাইজেরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আইএস-ওয়াপ–ই আইসিসের সঙ্গে সবচেয়ে সুস্পষ্টভাবে যুক্ত। সেই প্রেক্ষাপটে সোকোটো স্টেইটে হামলার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
একই সঙ্গে সাহেল অঞ্চল থেকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর দক্ষিণমুখী বিস্তার নাইজেরিয়া ও আশপাশের দেশগুলোর জন্য নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।
