দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে অ্যামেরিকা আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক প্রভাব এবং আদর্শিক নেতৃত্ব—এই তিন স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে ওঠে অ্যামেরিকার বৈশ্বিক আধিপত্য। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অ্যামেরিকার ভেতরের সংকট এখন আর কেবল অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; বরং তা সরাসরি আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতিপথকে প্রভাবিত করছে।
সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক প্রভাব এবং আদর্শিক নেতৃত্ব—এই তিন স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে ওঠে অ্যামেরিকার বৈশ্বিক আধিপত্য।
বর্তমানে অ্যামেরিকার সবচেয়ে বড় সংকট হলো অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনের আন্তর্জাতিক প্রতিফলন। দেশটির রাজনীতি এমনভাবে মেরুকৃত হয়ে পড়েছে যে, পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক চুক্তি, জোট ও কৌশলগত অঙ্গীকার বদলে যাচ্ছে—যা মিত্র দেশগুলোর মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করছে।
এই বিভাজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো অভিবাসন সংকট। আন্তর্জাতিক রাজনীতির দৃষ্টিতে অভিবাসন অ্যামেরিকার ‘সফট পাওয়ার’-এর অন্যতম ভিত্তি ছিল। বিশ্বের মেধাবী ও শ্রমশক্তির জন্য অ্যামেরিকা ছিল আকর্ষণের কেন্দ্র। কিন্তু কঠোর সীমান্ত নীতি, আশ্রয়প্রার্থীদের প্রতি দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থান এবং অভিবাসনকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা অ্যামেরিকার বৈশ্বিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।
লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে অ্যামেরিকার সম্পর্কেও এর প্রভাব স্পষ্ট। অভিবাসন ইস্যুতে চাপ সৃষ্টি করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে অ্যামেরিকাকে ওই অঞ্চলের স্বৈরতান্ত্রিক সরকারগুলোর সঙ্গে আপস করতে হচ্ছে, যা মানবাধিকার ও গণতন্ত্র প্রসারে তাদের ঘোষিত নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অ্যামেরিকার নৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ছে।
এদিকে ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের উত্থান—এই সব সংকট মোকাবিলায় অ্যামেরিকার নেতৃত্ব প্রয়োজন। কিন্তু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও অভিবাসন নিয়ে বিভক্ত জনমত বিদেশি সহায়তা, সামরিক ব্যয় ও কূটনৈতিক উদ্যোগে বাধা সৃষ্টি করছে। কংগ্রেসে বাজেট অনুমোদন নিয়ে জটিলতা এর স্পষ্ট উদাহরণ।
চীনের জন্য এই পরিস্থিতি কৌশলগত সুযোগ তৈরি করেছে। অ্যামেরিকা যখন নিজের ভেতরের সমস্যায় ব্যস্ত, তখন বেইজিং নিজেকে স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকারী শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। বৈশ্বিক দক্ষিণের অনেক দেশ অ্যামেরিকার নীতিগত অনিশ্চয়তার তুলনায় চীনের ধারাবাহিকতাকে বেশি বাস্তববাদী মনে করছে।
সবশেষে বলা যায়, অ্যামেরিকার বর্তমান সংকট মূলত একটি আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের সংকট। রাজনৈতিক বিভাজন ও অভিবাসন সংকট শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যই নষ্ট করছে না, বরং বিশ্ব রাজনীতিতে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা, ধারাবাহিকতা ও নৈতিক নেতৃত্বকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে। অ্যামেরিকা যদি আবার বৈশ্বিক নেতৃত্বের অবস্থান দৃঢ় করতে চায়, তবে তাকে আগে নিজের ভেতরের এই সংকটগুলোর একটি সুস্পষ্ট ও ঐকমত্যভিত্তিক সমাধান খুঁজে বের করতেই হবে।
