রবিবার সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে জাতিসংঘের পারমাণবিক তদারকি সংস্থা আইএইএ-র প্রধান রাফায়েল গ্রোসি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তার গভীর উদ্বেগ ও পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানান, কেবল প্রথাগত সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা চিরতরে মিটিয়ে দেওয়া অসম্ভব।
গ্রোসি বলেন, গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধ এবং নাতাঞ্জ ও ইসফাহানের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সাম্প্রতিক সামরিক হামলায় ইরানের কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তেহরানের বিশাল পারমাণবিক কর্মসূচির তুলনায় তা খুবই নগণ্য। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, ধ্বংসস্তূপের নিচে বা কোনো অত্যন্ত গোপন স্থানে ইরানের এখনো প্রচুর পরিমাণে ইউরেনিয়াম মজুদ থাকতে পারে যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য যথেষ্ট। গ্রোসির মতে, বোমা মেরে অর্জিত কারিগরি জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা কখনো মুছে ফেলা যায় না। দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য তিনি সামরিক শক্তির বদলে কূটনীতি এবং ইরানে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের অবাধ উপস্থিতির ওপর জোর দেন।
অ্যামেরিকায় নিযুক্ত ইযরায়েলি রাষ্ট্রদূত মাইকেল লেইটার ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল সক্ষমতা নিয়ে বিশ্বকে সতর্ক করেছেন। তিনি মনে করেন, ইরান যেভাবে প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা চালাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা আর সহ্য করার মতো পর্যায়ে নেই।
লেইটার উল্লেখ করেন, ভারত মহাসাগরের ডিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে ইরানের সাম্প্রতিক ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলা প্রমাণ করে যে তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা কত বিশাল। তিনি এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ভবিষ্যতে কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং অ্যামেরিকার শিকাগোর মতো বড় শহরেও আঘাত হানতে পারে। তিনি আরও জানান, বর্তমান শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতায় থাকলে ইযরায়েল ইরানের সমস্ত অবকাঠামো ধ্বংস করে দেবে। তার মতে, তীব্র বিমান হামলার মাধ্যমে ইরান সরকারকে এতটাই দুর্বল করতে হবে যাতে দেশটির সাধারণ মানুষ নিজেরাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে এই সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে।
এদিকে জাতিসংঘে অ্যামেরিকার রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টয জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে সরাসরি হামলার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছেন। ওয়াল্টযের মতে, ইরান যদি একবার পারমাণবিক অস্ত্র পেয়ে যায়, তবে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুর্কিয়েও এই প্রতিযোগিতায় নামবে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক পারমাণবিক অগ্নিকুণ্ডে পরিণত করবে।
ওয়াল্টয দাবি করেন, ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ঠিকই, কিন্তু বড় ধরনের বিপর্যয় এড়াতে বর্তমান সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়া জরুরি। এমনকি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে বড় ধরনের হামলার সম্ভাবনাও তিনি নাকচ করে দেননি।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অ্যামেরিকা ও ইযরায়েলের এই কঠোর অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তারা ইরানকে পারমাণবিক শক্তি হওয়া থেকে রুখতে যেকোনো চরম পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। আইএইএ প্রধানের সতর্কবার্তার পর প্রশ্ন উঠছে—তবে কি বিশ্ব একটি নতুন পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে? ওয়াশিংটনের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি এবং তেহরানের পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা এই অঞ্চলকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
