অ্যামেরিকার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে নতুন করে অস্বস্তি সৃষ্টি করেছে জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান দাম। দেশজুড়ে গ্যাসোলিন বা পেট্রোলের মূল্য অস্বাভাবিক হারে বাড়তে থাকায় একদিকে যেমন সাধারণ নাগরিকদের যাতায়াত খরচ বেড়েছে, অন্যদিকে পণ্য পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সীমাবদ্ধতাই এই মূল্যবৃদ্ধির প্রধান কারণ।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে গ্যাসোলিনের দামের এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। গত মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে অ্যামেরিকার বাজারে গ্যাসোলিনের দাম গ্যালন প্রতি ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে দেশজুড়ে গ্যাসোলিনের গড় দাম দাঁড়িয়েছে ৩ ডলার ৯৪ সেন্টে। পাম্পগুলোতে তেলের দামের এই আকস্মিক লাফ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর মাসিক বাজেটে বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউইয়র্কের মতো বড় শহরগুলোতে এই দাম গড়পড়তার চেয়েও অনেক বেশি, যা যাতায়াত খরচকে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে।
জ্বালানির এই ঊর্ধ্বমুখী দাম নিয়ে মুখ খুলেছেন অ্যামেরিকার ট্রান্সপোর্টেশন সেক্রেটারি শন ডাফি। তার মতে, দেশে গ্যাসোলিনের সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে এবং সংকটের কোনো কারণ নেই। তবে দাম বাড়ার বিষয়টি তিনি সরাসরি যুদ্ধের সাথে যুক্ত করেছেন। ডাফি মনে করেন, বর্তমানে তেলের দাম বাড়লেও চলমান যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার সাথে সাথেই বাজার স্বাভাবিক হয়ে আসবে এবং দাম দ্রুত কমে যাবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার নিশ্চয়তা দেওয়া হলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ কমছে না।
অন্যদিকে, তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে দ্রুত যুদ্ধ বন্ধের দাবি জানিয়েছেন ডেমোক্র্যাটিক সেনেটর ক্রিস মারফি। তিনি মনে করেন, তেলের দাম এখনই কমাতে হলে যুদ্ধের অবসান ঘটানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। সেনেটর মারফি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, “যদি দ্রুত যুদ্ধ বন্ধ করা না হয়, তবে আরও বেশি মানুষ এই যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” তার এই বক্তব্য অ্যামেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যেখানে যুদ্ধের খরচ ও জ্বালানি সংকট একে অপরের পরিপূরক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গ্যাসোলিনের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশটির পণ্য পরিবহণ বা লজিস্টিকস খাতে। অ্যামেরিকার বিশাল সাপ্লাই চেইন মূলত ট্রাক ও ভ্যানের ওপর নির্ভরশীল। জ্বালানির দাম ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্রোসারি পণ্য থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছুরই ডেলিভারি খরচ বেড়ে গেছে। এর ফলে বাজারে সাধারণ পণ্যের দামও নতুন করে বাড়তে শুরু করেছে, যা সাধারণ ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতাকে সংকুচিত করছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যদি মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি দ্রুত শান্ত না হয় এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা না কমে, তবে আগামী মাসগুলোতে গ্যাসোলিনের দাম আরও বাড়তে পারে। ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় পক্ষই এই জ্বালানি সংকটকে রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে ব্যবহার করছে। সাধারণ মানুষ এখন তাকিয়ে আছে প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। যুদ্ধ বন্ধ না হলে বা তেলের বাজারে স্থিতিশীলতা না ফিরলে অ্যামেরিকার অর্থনীতিতে এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদী স্থবিরতা নেমে আসার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
