আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায়ই ন্যাটো থেকে আমেরিকাকে বের করে নেওয়ার হুমকি দিয়ে থাকেন। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, আমেরিকা এই সামরিক জোটে থাকার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে পারে। বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ইসরায়েলের অভিযানে ইউরোপের মিত্রদেশগুলো সরাসরি অংশ না নেওয়ায় তিনি প্রকাশ্যে ক্ষোভ দেখিয়েছেন। তাঁর মতে, মিত্রদের সহযোগিতা আরও স্পষ্টভাবে আসা উচিত ছিল।
ন্যাটো হলো ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোর একটি সামরিক জোট, যা ১৯৪৯ সালে গঠিত হয়। বর্তমানে এই জোটে ৩২টি দেশ সদস্য। জোটটির মূল ভিত্তি হলো সম্মিলিত প্রতিরক্ষার নীতি। ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো একটি সদস্য দেশের ওপর হামলা হলে সেটিকে পুরো জোটের ওপর হামলা হিসেবে ধরা হয়। তবে এই নীতি কার্যকর করতে সব সদস্য দেশের সম্মতি প্রয়োজন। ইতিহাসে মাত্র একবার এই ধারা ব্যবহার করা হয়েছিল—২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকায় সন্ত্রাসী হামলার পর।
ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই ন্যাটোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছেন। তাঁর অভিযোগ, এই জোটের পেছনে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করে আমেরিকা, অথচ অনেক সদস্য দেশ তাদের প্রতিরক্ষা খাতে যথেষ্ট ব্যয় করে না। ২০১৪ সালে ন্যাটোর সদস্যদের জন্য একটি নির্দেশনা দেওয়া হয়, যেখানে বলা হয়েছিল প্রতিটি দেশকে তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের অন্তত ২ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করতে হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার এই লক্ষ্য পূরণে মিত্রদেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। তাঁর সেই চাপ এবং রাশিয়ার বাড়তে থাকা সামরিক হুমকির কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক দেশই তাদের সামরিক ব্যয় বাড়িয়েছে।
২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগেই ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটোকে “অপ্রাসঙ্গিক” বলে সমালোচনা করেছিলেন। এমনকি তাঁর প্রথম মেয়াদের সময়ও আমেরিকাকে এই জোট থেকে বের করে আনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। সে সময় অনেক কূটনীতিক ও জোটের নেতারা আশঙ্কা করেছিলেন যে আমেরিকা সত্যিই জোট ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
তবে বাস্তবতা হলো, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট একা সিদ্ধান্ত নিয়ে ন্যাটো থেকে বের হয়ে যেতে পারেন না। ২০২৩ সালের শেষ দিকে আমেরিকার কংগ্রেস একটি আইন পাস করে, যেখানে বলা হয়েছে—ন্যাটো ত্যাগ করতে হলে সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন অথবা কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন। অর্থাৎ ডোনাল্ড ট্রাম্প চাইলে একতরফাভাবে আমেরিকাকে ন্যাটো থেকে বের করে নিতে পারবেন না।
বিশ্লেষকদের মতে, ন্যাটো এখনো আমেরিকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নিরাপত্তা জোট। এই জোটের মোট প্রতিরক্ষা ব্যয়ের প্রায় ৬২ শতাংশই আসে আমেরিকার সামরিক বাজেট থেকে। পাশাপাশি আমেরিকার উন্নত গোয়েন্দা সক্ষমতা ও সামরিক শক্তি পুরো জোটের নিরাপত্তায় বড় ভূমিকা রাখে।
বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতার কারণে ইউরোপের দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষা আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। এই পরিস্থিতিতে আমেরিকা যদি ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যায়, তবে তা শুধু ইউরোপের নিরাপত্তার ওপরই নয়, বরং আমেরিকার নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থের ওপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এ কারণে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ন্যাটো ছাড়ার হুমকি মূলত মিত্রদেশগুলোর ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরির একটি কৌশল। বাস্তবে আমেরিকার মতো শক্তিশালী দেশের জন্য এই জোট ত্যাগ করা সহজ সিদ্ধান্ত নয়।
