ইরান ও অ্যামেরিকার চলমান সংঘাত এক জটিল মোড় নিয়েছে। একদিকে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প আলোচনার কথা বলছেন, অন্যদিকে অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দিয়ে রেখেছেন। এই প্রেক্ষাপটে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসছে: আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে ট্রাম্পের এসব পদক্ষেপ কি তাকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে?
যুদ্ধাপরাধ বা ‘ওয়ার ক্রাইম’ আসলে কী?
আন্তর্জাতিক আইন, বিশেষ করে জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় বেসামরিক নাগরিক বা অ-সামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। যদি কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা সামরিক কমান্ডার জেনে বুঝে এমন নির্দেশ দেন যা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘন করে, তবে তাকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত করা যায়।
ট্রাম্পের ক্ষেত্রে আইনি চ্যালেঞ্জগুলো কোথায়?
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ রস হ্যারিসন স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত সরাসরি সামরিক লক্ষ্যবস্তু না হলে সেখানে হামলা চালানো আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। যদি এই হামলায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা অচল হয়ে পড়ে বা ব্যাপক বেসামরিক মৃত্যু ঘটে, তবে একে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য করার সুযোগ থাকে।
২০২০ সালেও ট্রাম্প ইরানের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোতে হামলার হুমকি দিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক আইনে (১৯৫৪ সালের হেগ কনভেনশন) সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী স্থানে হামলা চালানো একটি সুনির্দিষ্ট যুদ্ধাপরাধ। বর্তমান যুদ্ধেও যদি এমন কোনো লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করা হয়, তবে তা হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (ICC) বিচারযোগ্য হতে পারে।
সাবেক মেরিন লেফটেনেন্ট অ্যামি ম্যাকগ্রেথ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ট্রাম্পের কৌশলকে ‘অসংগত’ বলে অভিহিত করেছেন। সামরিক প্রয়োজন ছাড়া (Military Necessity) কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের অবকাঠামো ধ্বংস করা যুদ্ধাপরাধের সংজ্ঞায় পড়ে।
পরাজিত হলে কি বিচার সম্ভব?
ইতিহাস বলে, যুদ্ধে জয়ী পক্ষ সাধারণত পরাজিত পক্ষের বিচার করে (যেমন: নুরেমবার্গ ট্রায়াল)। তবে অ্যামেরিকার ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। অ্যামেরিকা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (ICC) সদস্য নয়। ফলে আইসিসি চাইলেই সরাসরি ট্রাম্পের বিচার করতে পারবে না। তবে ট্রাম্প যদি এমন কোনো দেশে সফর করেন যারা আইসিসি-র সদস্য, তবে সেখানে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
সাবেক ডেমোক্র্যাটিক সেনেটর ক্লেয়ার ম্যাককাসকিল এবং অন্যান্য বিরোধীরা ইতিমধ্যেই এই যুদ্ধের লক্ষ্য ও বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। দেশে বা বিদেশে যুদ্ধের নৈতিক পরাজয় ঘটলে রাজনৈতিকভাবে দায়বদ্ধতার চাপ বাড়বে।
বর্তমানে ট্রাম্প পাঁচ দিনের একটি বিরতি নিয়েছেন। বিশ্লেষক গ্রেগ মাইর বা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মার্ক হার্টলিং মনে করেন, সামরিক উপদেষ্টাদের পরামর্শেই তিনি হয়তো আইনি ও কৌশলগত জটিলতা এড়াতে পিছু হটেছেন। কারণ, একটি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে বেসামরিক জানমালের ব্যাপক ক্ষতি হলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ট্রাম্পের ওপর যুদ্ধাপরাধের দায়ভার আসার প্রবল ঝুঁকি থাকে।
যুদ্ধাপরাধী হিসেবে দোষী সাব্যস্ত হওয়া একটি দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া। তবে ট্রাম্প যদি আলোচনার পথ ছেড়ে আবারও বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো অ-সামরিক খাতে হামলার নির্দেশ দেন, তবে আন্তর্জাতিক আইনের কাঠগড়ায় তাঁর অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়বে।
