ইরানের সঙ্গে অ্যামেরিকা ও ইযরায়েলের চলমান যুদ্ধ ২৪তম দিনে এসে এক নাটকীয় ও রহস্যময় মোড় নিয়েছে। হরমুয প্রণালি খুলে দিতে তেহরানকে দেওয়া ৪৮ ঘণ্টার চরমপত্র বা আল্টিমেটাম শেষ হওয়ার আগেই ইরানের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলার হুমকি থেকে সরে এসেছেন অ্যামেরিকার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’–এ এক আকস্মিক পোস্টে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও জ্বালানি খাতে প্রস্তাবিত হামলা আগামী পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত করা হয়েছে।
ট্রাম্পের এই পিছুটান বিশ্ব রাজনীতিতে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, উভয় পক্ষের মধ্যে অত্যন্ত ‘ফলপ্রসূ ও গঠনমূলক‘ আলোচনা হয়েছে এবং এই আলোচনার সাফল্যের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী সামরিক পদক্ষেপ নির্ধারিত হবে। তবে ট্রাম্পের এই দাবির বিপরীতে তেহরানের অনড় অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের সংশয় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ফ্লোরিডায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এবং পরবর্তীতে টেনেসির মেম্ফিসে এক গোলটেবিল বৈঠকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান, তাঁর বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার ইরানের শীর্ষস্থানীয় প্রতিনিধিদের সাথে নিবিড় আলোচনা চালাচ্ছেন। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব অত্যন্ত ‘বাস্তবসম্মত‘ ও ‘ইতিবাচক‘ মনোভাব দেখাচ্ছেন। ট্রাম্প বলেন, অ্যামেরিকা এমন একটি চুক্তি চায় যেখানে ইরানের কোনো পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কঠোর নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইরানের প্রথম ও দ্বিতীয় সারির অনেক নেতা বর্তমানে দৃশ্যপটে নেই, যার ফলে দেশটিতে চরম নেতৃত্ব সংকট তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, ইরান এখন একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে মরিয়া কারণ এটিই তাদের সামনে ‘শেষ সুযোগ’। তবে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন যে, পাঁচ দিনের এই বিরতির মধ্যে কোনো সমাধান না হলে অ্যামেরিকা ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই সুর বদলের সঙ্গে সুর মিলিয়েছেন ইযরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু। তিনি সোমবার জানান, ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে এবং ইরানের সঙ্গে একটি লাভজনক চুক্তিতে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে তিনিও মনে করেন। নেতানিয়াহুর মতে, ইযরায়েল ও অ্যামেরিকার সামরিক বাহিনীর অর্জিত সাফল্যকে কাজে লাগিয়ে যুদ্ধের লক্ষ্যগুলো অর্জনের এটাই মোক্ষম সময়। তবে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, লেবানন ও ইরানে ইযরায়েলের সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় তারা কোনো আপস করবে না।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু আলোচনার কথা বললেও ইরান তা পুরোপুরি অস্বীকার করেছে। দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ অ্যামেরিকার সাথে আলোচনার খবরকে ‘ডাহা মিথ্যা‘ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি পাল্টা দাবি করেন, বিশ্ব তেলের বাজার ও নিজেদের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতেই অ্যামেরিকা এ ধরনের গুজব ছড়াচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই এবং খাতাম আল-আনবিয়া সদর দপ্তরের মুখপাত্র ইব্রাহিম যোলফাগারি হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, হরমুয প্রণালি ও উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের পূর্ণ কর্তৃত্ব বজায় আছে। তারা কোনো হুমকির মুখে মাথা নত করবে না এবং আলোচনার খবরটি ভিত্তিহীন।
ট্রাম্পের এই হঠাৎ পিছুটানকে বিশ্লেষকরা দেখছেন প্রশাসনের অদূরদর্শিতা হিসেবে। এনপিআর ন্যাশনাল সিকিউরিটি করেসপন্ডেন্ট গ্রেগ মাইর বলেন, ট্রাম্প বলছেন আলোচনা হচ্ছে, অথচ ইরান তা অস্বীকার করছে—এই পরিস্থিতিতে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ ছাড়া ট্রাম্পের কথা বিশ্বাস করা কঠিন। তবে ওমানের মতো মধ্যস্থতাকারী কোনো দেশের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে কিছু ঘটে থাকতে পারে বলে তিনি ধারণা করেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অ্যামান্ডা কার্পেন্টার ট্রাম্প প্রশাসনের স্পষ্ট কোনো রণকৌশল নেই বলে সমালোচনা করেছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি ইরানের সক্ষমতা ধ্বংসই হয়ে থাকে, তবে এখনকার সামরিক লক্ষটা আসলে কী? অন্যদিকে, লেফটেন্যান্ট জেনারেল মার্ক হার্টলিং মনে করেন, হরমুয প্রণালি চালুর জন্য ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেওয়াটা মোটেও বাস্তবসম্মত ছিল না। সম্ভবত সামরিক উপদেষ্টাদের চাপ বা পরামর্শেই ট্রাম্প এখন যুদ্ধ থেকে পিছু হটার জন্য আলোচনার অজুহাত খুঁজছেন, যা একটি বিশৃঙ্খল সামরিক কৌশলের বহিঃপ্রকাশ।
মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ রস হ্যারিসন সতর্ক করেছেন যে, যুদ্ধবিরতি বা আলোচনার দোহাই দিয়ে পাঁচ দিন পর যদি অ্যামেরিকা আবারও ইরানের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালায়, তবে তা আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ বলে গণ্য হবে। সাবেক ডেমোক্র্যাটিক সেনেটর ক্লেয়ার ম্যাককাসকিল এই যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, অ্যামেরিকার সাধারণ মানুষ এই অর্থহীন যুদ্ধ চায় না এবং হরমুয প্রণালি বন্ধ থাকলে জ্বালানি সংকটে খোদ অ্যামেরিকাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সাবেক মেরিন কর্মকর্তা অ্যামি ম্যাকগ্রেথ ট্রাম্পের অবস্থানকে ‘অসঙ্গতিপূর্ণ‘ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, দুই দিন আগে সব ধ্বংস করার হুমকি দিয়ে এখন শান্তি আলোচনার কথা বলায় প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ২৪ দিনের এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত এখন এক রহস্যময় সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। ট্রাম্পের দেওয়া পাঁচ দিনের সময়সীমা শেষে মধ্যপ্রাচ্য শান্তির পথে হাঁটবে নাকি আরও ভয়াবহ কোনো ধ্বংসযজ্ঞের দিকে এগোবে, তা নিয়ে সারাবিশ্ব এখন গভীর উদ্বেগের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে।

