
ইরান ও অ্যামেরিকা-ইযরায়েল জোটের মধ্যকার চলমান যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই এর বিশাল ব্যয়ভার নিয়ে ওয়াশিংটনের নীতি-নির্ধারণী মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। সামরিক বিশ্লেষক ও সাবেক জেনারেলদের মতে, এই দীর্ঘ লড়াইয়ের গাণিতিক হিসাব কোনোভাবেই অ্যামেরিকা ও ইযরায়েলের পক্ষে যাচ্ছে না। বিশেষ করে ইরানের তুলনায় মিত্রশক্তির প্রতিরক্ষা ব্যয় বহুগুণ বেশি হওয়ায় এই যুদ্ধকে একটি ‘অর্থহীন ক্ষয়যুদ্ধ’ হিসেবে দেখছেন অনেকে।
সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় সংকট হলো খরচের ভারসাম্যহীনতা। ইরান তুলনামূলক কম খরচে তাদের তৈরি ‘শাহেদ’ ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালাচ্ছে। অন্যদিকে, এই সস্তা ড্রোনগুলো আকাশেই ধ্বংস করতে অ্যামেরিকা ও ইযরায়েলকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হচ্ছে।
উদাহরণস্বরূপ, ইরানের একটি ড্রোন তৈরি করতে যে খরচ হয়, সেটি ভূপাতিত করতে ব্যবহৃত প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের দাম কয়েক মিলিয়ন ডলার। সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে এই ধরনের ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চালানো আর্থিকভাবে টেকসই নয়। ফলে সময়ের সাথে সাথে এই গাণিতিক লোকসান অ্যামেরিকা ও ইযরায়েলের অর্থনীতিতে বড় ক্ষত তৈরি করছে।
ইতিমধ্যেই এই যুদ্ধ পরিচালনা করতে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত তহবিল চাওয়া হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, এটি কেবল যুদ্ধের শুরুর খরচ। যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং বিস্তৃতি বিবেচনা করলে দীর্ঘমেয়াদে এই ব্যয় ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে তারা অনুমান করছেন। এই বিশাল অঙ্কের অর্থ কীভাবে জোগান দেওয়া হবে, তা নিয়ে অ্যামেরিকার ভেতরেই শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।
অ্যামেরিকার সাবেক মেজর জেনারেল ডেনা পিটার্ডের মতে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা কিছুটা দুর্বল হলেও তা মোটেও শেষ হয়ে যায়নি। ইরান এখনো তাদের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা ধরে রেখেছে। এমনকি ইউরোপের কিছু অংশও এখন তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় চলে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক এক হামলায় দেখা গেছে, ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্র ভারত মহাসাগরের ডিয়েগো গার্সিয়ার দিকে ছোঁড়া হয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ ইযরায়েলের একটি পারমাণবিক গবেষণা স্থাপনার কাছাকাছি ইরানি হামলায় বেশ কিছু মানুষ আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, ইরান এখনো বড় ধরনের পাল্টা আঘাত হানতে সক্ষম।
অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি এই যুদ্ধের রাজনৈতিক দিকটিও অ্যামেরিকা প্রশাসনের জন্য জটিল হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, অ্যামেরিকার সাধারণ জনগণের একটি বড় অংশ এই যুদ্ধ নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। অধিকাংশ নাগরিকই জানেন না এই যুদ্ধের প্রকৃত লক্ষ্য কী। বিশেষ করে ইরানে স্থলবাহিনী পাঠানোর মতো সিদ্ধান্তের পক্ষে জনসমর্থন প্রায় শূন্যের কোঠায়।
কানেকটিকাটের ডেমোক্র্যাটিক সেনেটর ক্রিস মারফি এই যুদ্ধের কড়া সমালোচনা করেছেন। এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “ইরান যুদ্ধ এরই মধ্যে অযৌক্তিক হয়ে উঠেছে। দেশের মানুষ এই অর্থহীন সংঘাত চায় না।” তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, সেনেটের কাছে ইরান যুদ্ধের জন্য আরও ২০০ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দের যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তিনি তার তীব্র বিরোধিতা করবেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই যুদ্ধ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে কোনো পক্ষই দ্রুত জয় পাচ্ছে না। বরং দুই পক্ষই দীর্ঘ লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে এই ক্ষয়যুদ্ধে সামরিক শক্তির চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থনৈতিক টিকে থাকা। যে হারে অ্যামেরিকার অর্থ খরচ হচ্ছে, তাতে সামরিক সাফল্য আসলেও অর্থনৈতিকভাবে দেশটি বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরানের সস্তা সমরাস্ত্রের বিপরীতে অ্যামেরিকার ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যয়বহুল যুদ্ধ কৌশল ওয়াশিংটনকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
