এক মাস গড়ালো ইরান – ইজরালের আর আমেরিকার যুদ্ধ। এই যুদ্ধে ইরান তাদের সর্বোচ্চ নেতাসহ বিভিন্ন বড়-বড় সামরিক নেতাদের হারিয়েছে। কিন্তু প্রতিশোধ নিতে পিছু পা হয়নি তেহরান। পরিবর্তন এসেছে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃত্বে কিন্তু আগ্রাসী হামলা চালিয়েছে সেই শুরু থেকে।
তবে যুদ্ধের ময়দানে আরো শক্ত অবস্থানে এক ধাপ এগিয়ে যাচ্ছে ইরান।। এবার ঘোষণা দিয়ে ইরানের সাথে জোট বদ্ধ হচ্ছে ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথি… এছাড়া লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাকের বিভিন্ন মিলিশিয়া…
ইরান ও ইয়েমেনের হুতি জোট
“আমরা কেবল ইয়েমেনের সীমানায় সীমাবদ্ধ নই। গাজার নিপীড়িত মানুষের পক্ষে এবং আমেরিকা ও ইজরায়েলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আমরা ইরানের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই চালিয়ে যাব। লোহিত সাগর এখন আমাদের নিয়ন্ত্রণে এবং বিজয় না আসা পর্যন্ত আমরা পিছু হটব না।”
হ্যা, গতকাল এমন হিশিয়ারি দিয়েছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী (আনসারুল্লাহ) এর প্রধান সামরিক কমান্ডার আবদুল মালিক আল-হুতি। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা (আনসার আল্লাহ) দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের সমর্থন পেয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই সম্পর্ক আরও প্রকাশ্য ও কৌশলগত হয়েছে।
হুতিদের দাবি, তারা শুধু ইয়েমেন নয়, পুরো অঞ্চলে আমেরিকা ও ইজরায়েলের প্রভাব ঠেকাতে লড়ছে। লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা, ড্রোন আক্রমণ—সবই এই বৃহত্তর কৌশলের অংশ।
যুদ্ধক্ষেত্রে ইরানের কৌশল
ইরান সরাসরি যুদ্ধ না করলেও “প্রক্সি যুদ্ধ” চালাচ্ছে। ইয়েমেন, লেবানন (হিজবুল্লাহ), ইরাকের বিভিন্ন মিলিশিয়া—সব মিলিয়ে একটি বড় নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে তারা।
সেই প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বর্তমানে ইরান চায় উপসগরীয় মুসলিম অঞ্চলে সামরিক প্রভাব বাড়াতে। একি সাথে ইজরায়েলের উপর চাপ সৃষ্টি করতে এবং এবং আমেরিকাকে এই অঞ্চলের প্রভাব বিস্তারে বাধা তৈরি করতে।
আর সেই পরিস্থিতি তৈরি করতে তারা সামতিক ভাবে যেমন বর্তমানে শক্ত অবস্থানে আছে, তেমনি হরমুজ প্রনালী বন্ধ করে বানিজ্যিক ভাবে কৌশলগত দিক থেকে তারা ব্যাপক চাপ তৈরি করেছে আমেরিকার উপর। বর্তমানে সরাসরি যুদ্ধে না গিয়ে “ময়দান দখল” করছে তাদের ইরান মিত্রদের মাধ্যমে।
আমেরিকা ও ইজরায়েল কেন পিছু হাটছে?
অনেক বিশ্লেষকের মতে, আমেরিকা ও ইজরায়েল সরাসরি বড় আকারের যুদ্ধ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে। এর কয়েকটি কারণ: বহুমুখী যুদ্ধের ঝুঁকি ইরানের সাথে সরাসরি যুদ্ধ মানেই একাধিক ফ্রন্ট—ইয়েমেন, লেবানন, সিরিয়া—সব জায়গায় সংঘাত ছড়িয়ে পড়া।
অর্থনৈতিক চাপ
ইতোমধ্যেই বিশ্ব অর্থনীতি চাপে আছে। নতুন বড় যুদ্ধ মানেই তেলের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ সংকট। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ আমেরিকার ভেতরেই যুদ্ধবিরোধী মনোভাব বাড়ছে। আমেরিকার ভেতরে অসন্তোষ
ডোনাল্ড ট্রাম্পের-এর প্রশাসন নিয়ে আমেরিকার জনগণের মধ্যে বিভক্তি স্পষ্ট।
অধিকাংশ আমেরিকান মনে করছেন বিদেশে অতিরিক্ত সামরিক ব্যয় দেশের অর্থনীতিকে দুর্বল করছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সাথে যুদ্ধে জড়ানো দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক নয় বরং বড় ধরনের ক্ষতি ।
ইতিমধ্যে আমেরিকার বাজারে সব ধরনের জ্বালানীর দাম বেড়েছে। শেয়ার বাজারে ব্যাপাক ধস। আর ট্রাম্প প্রসাশনের এই সিদ্ধান্তগুলো জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ করছে বিরোধী রাজনৈতিক ব্যক্তিরা। ফলে আমেরিকার অভ্যন্তরে যুদ্ধ ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতির ধস—ইউরোপের অভিযোগ
ট্রাম্পের হটকারী যুদ্ধের সিদ্ধান্তকে গত কয়েকদিন ধরেই বিরোধীতা করে আসছে তার ঘনিষ্ঠ অনেক ইউরোপের দেশ। এবার সরাসরি ইউরোপের কিছু নেতা ও অর্থনীতিবিদ বলছেন, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার পেছনে আমেরিকার ট্রাম্প প্রসাশনের পাগলামীই বড় কারণ।
তাদের অভিযোগ, এর আগে আমেরিকার শুল্কহার বৃদ্ধি বিশ্ববাজারে চাপ সৃষ্টি করছে।
সেই সাথে চলমান যুদ্ধের জেরে ডলার শক্তিশালী হওয়ায় অন্যান্য দেশের মুদ্রা দুর্বল হচ্ছে।
ইরানের হরমুজ প্রনালী বন্ধ হবার ফলে বিশ্ব বাণিজ্যনীতি বিশ্ব চেইন ভয়ঙ্কর দুর্বল অবস্থানে পড়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি ও খাদ্য বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বড় ঝুঁকি।
সবকিছুর মধ্যে সংযোগ কী?
এই পুরো পরিস্থিতি আসলে একে অপরের সাথে গভীরভাবে যুক্ত: চলেন কয়েকটা গুরুত্বপুর্ন বিষয় তুলে ধরা যাক……
ইরান ও হুতিদের সামরিক পদক্ষেপ → লোহিত সাগরে অস্থিরতা
এর ফলে → বাণিজ্য ব্যাহত
বাণিজ্য ব্যাহত হলে → বিশ্ব অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত
অর্থনৈতিক চাপ বাড়লে → আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অসন্তোষ
অর্থাৎ, একটি আঞ্চলিক সংঘাত ধীরে ধীরে বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিচ্ছে।
পরিশেষে বলা যায়, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। ইরান তার প্রভাব বাড়াতে মরিয়া, হুতিরা সক্রিয়ভাবে জোটে যুক্ত, আর আমেরিকা ও ইজরায়েল কৌশলগতভাবে পিছিয়ে থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে, যুদ্ধের প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে ধস নামাচ্ছে—যার দায় নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বেও বিভক্তি দেখা যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত শুধু একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়—এটি এখন বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য, অর্থনীতি এবং রাজনীতির বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
