আধুনিক বাংলাদেশের অর্থনীতি ও অগ্রযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ নারীরা। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু রাজনৈতিক বক্তব্য এই অর্জনকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর আমিরের অ্যাকাউন্ট থেকে আসা একটি মন্তব্য যেখানে ঘরের বাইরে নারীর কাজকে ‘আধুনিকতার নামে পতিতাবৃত্তি’র সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে—তা কি কেবল একটি ‘হ্যাকড’ হওয়া পোস্ট, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো গভীর আদর্শিক সংঘাত?
জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান ও বিতর্কিত বক্তব্য
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে বলা হয় যে, আধুনিকতার নামে নারীদের ঘর থেকে বের করা আসলে ‘পতিতাবৃত্তির এক নতুন রূপ’। যদিও পরবর্তীতে জামায়াত দাবি করেছে অ্যাকাউন্টটি হ্যাক হয়েছিল এবং এটি তাঁদের দলীয় অবস্থান নয়, তবে সমালোচকরা বলছেন এটি তাঁদের দীর্ঘদিনের রক্ষণশীল মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ। এর আগেও জামায়াত নারী নেতৃত্বের বিপক্ষে কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং দাবি করেছে যে কোনো নারী কখনোই তাঁদের দলের প্রধান বা আমির হতে পারবেন না।
নারী সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রতিক্রিয়া
নারী অধিকার সংগঠন যেমন— ‘নারীপক্ষ’ এই মন্তব্যকে “মধ্যযুগীয় মানসিকতা” হিসেবে বর্ণনা করেছে এবং বলেছে এটি বাংলাদেশকে লিঙ্গ সমতার ক্ষেত্রে পিছিয়ে দেবে। নারী সমাজের মতে, কর্মক্ষেত্রে থাকা নারীরা সম্মান, অর্থনৈতিক মুক্তি ও মর্যাদার সাথে বাঁচতে চায়; জামায়াতের প্রস্তাবিত ‘নারীদের জন্য ৫ ঘণ্টা কর্মঘণ্টা’র ধারণা আসলে তাঁদের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দেওয়ার একটি অপকৌশল মাত্র।
পরিসংখ্যান: কর্মক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারী:
বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার প্রায় ৪৪.২ শতাংশ । তৈরি পোশাক শিল্প থেকে শুরু করে প্রশাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের নারীরা আজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন। এই বিপুল পরিমাণ নারী শক্তিকে উপেক্ষা করা বা তাঁদের কাজকে নেতিবাচকভাবে সংজ্ঞায়িত করা দেশের অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতামত ও বর্তমান সংঘাত:
বিশ্লেষকদের মতে, একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে জামায়াতের এই ধরনের চিন্তা অত্যন্ত সাংঘর্ষিক। যেখানে বেগম রোকেয়ার স্বপ্নের পথে হেঁটে বাংলাদেশ আজ নারীর ক্ষমতায়নের রোল মডেল, সেখানে নারীদের ঘরের কোণে রাখার প্রস্তাব প্রগতির চাকা পেছনে ঘুরিয়ে দেওয়ার নামান্তর। বিশ্লেষকরা মনে করেন, আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে লিঙ্গ বৈষম্য ও ধর্মীয় অপব্যাখ্যা দিয়ে নারীদের দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ কি সামনে এগোবে নাকি পেছনে ফিরবে, তা নির্ভর করবে আমরা নারী সমাজকে কতটা মর্যাদা ও সুযোগ দিতে পারছি তার ওপর। কোনো রাজনৈতিক দলের সংকীর্ণ মতাদর্শ যেন দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর অগ্রগতিতে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেটাই আজ সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।
