বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস মানেই উত্তপ্ত রাজপথ, মিছিল আর ব্যালট যুদ্ধের টানটান উত্তেজনা। ২০০১ থেকে ২০২৪—এই দুই দশকে বাংলাদেশ দেখেছে পাঁচটি সাধারণ নির্বাচন। প্রতিটি নির্বাচনই জন্ম দিয়েছে নতুন বিতর্কের, বদলে দিয়েছে রাজনীতির সমীকরণ। আজ আমরা বিশ্লেষণ করবো এই পাঁচটি নির্বাচনের স্বচ্ছতা, সহিংসতা আর পর্দার পেছনের অমীমাংসিত সত্য। 
২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচন। এটি ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হওয়া তৃতীয় নির্বাচন।
এই নির্বাচন তুলনামূলকভাবে অংশগ্রহণমূলক ছিল। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-জামায়াত জোটের মধ্যে মূল লড়াই হয়। লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে আওয়ামী লীগ। তাদের অভিযোগ ছিল, প্রশাসন একপাক্ষিক কাজ করেছে।
নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর বড় ধরনের হামলার অভিযোগ ওঠে, যা আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচিত হয়। বিএনপি-জামায়াত জোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে।
২০০৬ সালের অস্থিতিশীলতার পর জারি হয় জরুরি অবস্থা। দুই বছরের ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’র ব্যর্থতা শেষে ২০০৮ সালে হয় নবম সংসদ নির্বাচন।
স্বচ্ছতা: এই নির্বাচনে প্রথমবার ডিজিটাল ভোটার লিস্ট ও ছবিসহ পরিচয়পত্র ব্যবহার করা হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কমনওয়েলথ একে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
ফলাফল: নিরঙ্কুশ জয় পায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট।
বিতর্ক: রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা না হওয়ায় সেনাসমর্থিত সরকারের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষমতা দখল নিয়ে প্রশ্ন ছিল।
বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত মোড় আসে ২০১৪ সালে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হওয়ার পর দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপিসহ ১৮টি দল।
সহিংসতা: দেশজুড়ে চলে নজিরবিহীন জ্বালাও-পোড়াও এবং সহিংসতা। শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
স্বচ্ছতা: ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৪টি আসনে কোনো ভোটই হয়নি, প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হন। Human Rights Watch এই নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। এটি আন্তর্জাতিকভাবে বড় ধরনের গ্রহণযোগ্যতার সংকটে পড়ে।
২০১৮ সালের একাদশ নির্বাচনে সব দল অংশ নিলেও অভিযোগ ওঠে নতুন কৌশলের।
বিতর্ক: বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল, ভোটের আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভরা হয়েছে—যা লোকমুখে ‘রাতের ভোট’ হিসেবে পরিচিতি পায়।
স্বচ্ছতা: Transparency International Bangladesh (TIB)-এর গবেষণায় ৪৭টি আসনে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রশাসন ও পুলিশের অতি-সক্রিয়তা নির্বাচনের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
সহিংসতা: ভোটের দিনও বেশ কিছু প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
সবশেষ ২০২৪ সালের দ্বাদশ নির্বাচন। বিরোধী দলগুলোর তত্ত্বাবধায়কের দাবি নাকচ করে ক্ষমতায় থেকেই নির্বাচন করে আওয়ামী লীগ।
কৌশল: বিএনপি নির্বাচন বর্জন করলে ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে সরকারি দলের নেতারাই ‘ডামি’ বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ান।
স্বচ্ছতা ও হত্যা: অনেক দেশ এই নির্বাচনকে ত্রুটিপূর্ণ বললেও ভারত ও চীন একে সমর্থন দেয়। নির্বাচনের আগে ও পরে গণগ্রেপ্তার এবং দমন-পীড়নের খবর Amnesty International বারবার তুলে ধরেছে। নির্বাচনের দিন সহিংসতায় কয়েকজন নিহত হন।
২০০১ থেকে ২০২৪—দুই দশকে নির্বাচনী ব্যবস্থার এই পরিবর্তন আমাদের গণতন্ত্রের জন্য কী বার্তা বহন করছে? নির্বাচন কি শুধুই ক্ষমতার পালাবদল, নাকি জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন?
