
ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অপসারণের পর, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন তাঁর একবিংশ শতাব্দীর সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রকল্পের জন্য নতুন ভূখণ্ড খুঁজছেন। প্রথম মেয়াদে ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আগ্রহকে অনেকেই ঠাট্টা হিসেবে দেখেছিলেন। এবার তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটনাতে উদগ্রিব হয়ে উঠেছেন মিস্টার প্রেসিডেন্ট।
সেই লক্ষ্যেই গত বছর, ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র তাঁর বাবার বিমানে করে বিশাল দ্বীপটিতে যান এবং পরে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স হাজির হন জরুরী সফরে। তখনো বিষয়টি হাসি তামাশার বিষয় ছিলো, কিন্তু এখন আর কেউ হাসছে না।
ইউরোপীয় নেতারা ট্রাম্পের হুমকিকে এখন গুরুত্বের সঙ্গেই নিচ্ছেন। ট্রাম্পের শীর্ষ সহযোগী স্টিফেন মিলার সম্প্রতি সতর্ক করে বলেন, অ্যামেরিকা এমন এক বিশ্বব্যবস্থার আইন অনুসরণ করছে, যা শক্তি, বলপ্রয়োগ ও ক্ষমতা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
ভেনিজুয়েলায় অ্যামেরিকার সামরিক অভিযানের পর মার-আ-লাগোতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার।
ট্রাম্পের প্রকাশ্য যুক্তি—জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে অ্যামেরিকাকে গ্রিনল্যান্ড দখল করতেই হবে।
কৌশলগত রত্ন
গ্রিনল্যান্ড কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর গুরুত্ব আরও বাড়ছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ‘গ্রিনল্যান্ড এয়ার গ্যাপ’ নামে পরিচিত সমুদ্রপথ নাৎসি সাবমেরিনগুলোর জন্য মিত্রশক্তির বাণিজ্যিক কনভয় ধ্বংসের এক ভয়ংকর হত্যাক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিলো। ভবিষ্যতে কোনো বড় যুদ্ধে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ মানেই আটলান্টিকের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের কর্তৃত্ব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আট দশক পর, বরফ গলে যাওয়ায় গ্রিনল্যান্ড এখন ভূরাজনৈতিকভাবেও ‘উষ্ণ’ হয়ে উঠছে। বিশ্বের ছাদের ওপর নতুন নৌপথ খুলে যাচ্ছে।
চীন ও রাশিয়াও ট্রাম্পের মতোই জানে এই দ্বীপটি কতটা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রাম্প বলছেন, অ্যামেরিকার নিরাপত্তার জন্য গ্রিনল্যান্ড দরকার। কিন্তু বাস্তবে যদি সত্যিই নিরাপত্তার ঝুঁকি থাকে, তাহলে গ্রিনল্যান্ড দখল না করেও অ্যামেরিকা নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। কারণ গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অধীন হলেও সেটি ন্যাটোরই একটি অংশ, আর ডেনমার্ক অ্যামেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্র।
গ্রিনল্যান্ডে এখনো পুরোপুরি কাজে না লাগানো তেল ও গ্যাসের বিশাল ভান্ডার রয়েছে। বরফ গলে গেলে বিরল খনিজ সম্পদের উত্তোলন আরও সহজ হবে। এটি ভবিষ্যতের প্রযুক্তি ও অস্ত্রশিল্পের জন্য অপরিহার্য।
যদি ট্রাম্পের আগ্রহ বিরল খনিজে হয়, তাহলে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড-দুই পক্ষই অংশীদারিমূলক চুক্তির বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। কিন্তু ট্রাম্প যে ভাগাভাগির পথে হাঁটছেন—তার কোনো লক্ষণ নেই।

ক্রমেই আতঙ্কিত ইউরোপ
ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড, স্পেন ও যুক্তরাজ্যের নেতারা ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেনের সঙ্গে এক কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন—‘গ্রিনল্যান্ড গ্রিনল্যান্ডের জনগণের।’
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি আগামী মাসে উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন। গ্রিনল্যান্ড দখলের যেকোনো প্রচেষ্টার ভূরাজনৈতিক প্রভাব হবে ভয়াবহ।
ফ্রেডেরিকসেন আগেই সতর্ক করেছেন—বলপ্রয়োগে গ্রিনল্যান্ড নেওয়ার চেষ্টা ন্যাটোকে ধ্বংস করে দেবে।
ডেনমার্ক ছোট দেশ হলেও আফগানিস্তান ও ইরাকে অ্যামেরিকার যুদ্ধে তারা অসামান্য আত্মত্যাগ করেছে। এমন বন্ধুদের অপমানের পর ভবিষ্যতে অ্যামেরিকার ডাকে তারা সাড়া দেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু হোয়াইট হাউস ক্ষমতা প্রয়োগ করছে—কারণ তারা তা পারে।
ইউরোপের নিরাপত্তা নির্ভরতা ট্রাম্পকে বড় সুবিধা দিয়েছে। বাস্তবতা হলো—গ্রিনল্যান্ডে অ্যামেরিকা আক্রমণ করলে ইউরোপীয় বা ডেনিশ বাহিনীর পক্ষে তা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। মিলারের ভাষায়, ‘গ্রিনল্যান্ডের জন্য কেউ অ্যামেরিকার সঙ্গে যুদ্ধে যাবে না।’
সব মিলিয়ে, গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নটি শুধু একটি দ্বীপ নয়—এটি বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে এক গভীর সংকেতই প্রকাশ করছে।

