খোলা মাটিতে সারি সারি করে বসে আছেন পুরুষরা। সবার পোশাক একরকম—বাদামি প্যান্ট, সাদা শার্ট আর কালো টুপি। তাঁরা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস-এর স্বেচ্ছাসেবক। নাগপুরে সংগঠনের শতবর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁরা বক্তব্য শুনছেন। নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই দৃশ্যকে তুলে ধরা হয়েছে ভারতের ক্ষমতার রাজনীতির প্রতীক হিসেবে—যেখানে এক সময় আড়ালে থাকা সংগঠনটি আজ রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে আরএসএস শুধু একটি রাজনৈতিক সংগঠন নয়, এটি তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেরও অংশ। চলতি বছর স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে—যা তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাৎসরিক বক্তব্য—তিনি প্রকাশ্যে সেই সংগঠনের প্রশংসা করেন, যা শৈশব থেকে তাঁর জীবন গড়ে তুলেছে। ক্ষমতায় থাকার ১১ বছরে এটাই ছিল আরএসএসের প্রতি তাঁর সবচেয়ে স্পষ্ট ও জোরালো স্বীকৃতি।
১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত আরএসএস-এর লক্ষ্য ছিল বহু শতকের মুসলিম শাসন ও ব্রিটিশ উপনিবেশের পর হিন্দু সমাজের আত্মসম্মান ফিরিয়ে আনা। সংগঠনের প্রথম দিকের নেতারা ১৯৩০ ও ৪০-এর দশকের ইউরোপিয়ান ফ্যাসিবাদী আন্দোলন থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছিলেন এবং ভারতের পরিচয়কে একমাত্র হিন্দু হিসেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। গান্ধী হত্যার সঙ্গে যোগ থাকার অভিযোগে একাধিকবার নিষিদ্ধ হওয়ায় দীর্ঘদিন সংগঠনটি বিতর্কিত ছিল।
আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আরএসএস এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ডানপন্থী সংগঠন। নরেন্দ্র মোদির মতো আজীবন আরএসএস সদস্য দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ায় সংগঠনটি এমন স্বীকৃতি ও প্রভাব পেয়েছে, যা এক সময় কল্পনাও করা যায়নি। ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থাকে হিন্দু-প্রাধান্যভিত্তিক রাষ্ট্রে রূপান্তরের তাদের লক্ষ্য এখন অনেকটাই বাস্তবের কাছাকাছি।
এই ক্ষমতা শুধু নির্বাচনে জয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আরএসএস অসংখ্য সহযোগী সংগঠনের মাধ্যমে ভারতের প্রায় সব প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ঢুকে পড়েছে—রাজনীতি, প্রশাসন, আদালত, পুলিশ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, শ্রমিক সংগঠন ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। তারা রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়ে দেয় বা ভেঙে দেয় এবং মিলিয়ন মিলিয়ন তরুণকে হিন্দু জাতীয়তাবাদের মাধ্যমে সামাজিক প্রভাব ও পরিচয়ের পথ দেখায়।
যখন বিজেপি বড় নির্বাচনে জয় পায়, তখন তার পেছনে থাকে আরএসএস-এর শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো। আর যখন হিন্দু উগ্রবাদীরা মুসলিম পাড়া বা গির্জায় হামলা চালায়, তখন প্রায়ই দেখা যায়, তারা আরএসএস-ঘনিষ্ঠ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। এরফলে ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন মানুষের দেশে ধর্মীয় বিভাজন আরও তীব্র হয়েছে। প্রায় ২০০ মিলিয়ন মুসলমান ও খ্রিস্টানকে প্রায়ই “বিদেশি উত্তরাধিকারী” হিসেবে দেখানো হয়।
বাইরে থেকে আরএসএস নিজেকে একটি সামাজিক ও সেবামূলক সংগঠন হিসেবে তুলে ধরে। এর ভিত্তি হলো ‘শাখা’—প্রতিদিনের পাড়াভিত্তিক সভা, যেখানে শরীরচর্চা, গান ও আদর্শগত শিক্ষা দেওয়া হয়। বর্তমানে সারা দেশে প্রায় ৮৩ হাজার শাখা রয়েছে। এখান থেকেই সংগঠন ভবিষ্যৎ নেতাদের বাছাই করে।
বিজেপির পাশাপাশি আরএসএস-এর ছাত্র সংগঠন, শ্রমিক ইউনিয়ন, কৃষক সংগঠন, পেশাজীবী সংগঠন ও নানা দাতব্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আইনি দিক থেকে আলাদা হলেও এরা একই আদর্শে একসঙ্গে কাজ করে। আরএসএস-ঘনিষ্ঠ এক শিক্ষাবিদের ভাষায়, ক্ষমতা পেলে সব কিছু ঠিক হয়ে যায়।
সংগঠনটি বিশাল হলেও এর কাজকর্মে স্বচ্ছতা খুব কম। বিস্তারিত হিসাব রাখা হয় না, কেন্দ্রীয় সম্পত্তিও নেই। তাদের শক্তি মানুষের মধ্যেই—এটাই নেতাদের দাবি।
আরএসএস-এর আদর্শ একসময় খুবই স্পষ্ট ও কঠোর ছিল। ১৯৩৯ সালে সংগঠনের নেতা এম.এস. গোল-ওয়াল-কর লিখেছিলেন, জার্মানিতে ইহুদিদের সঙ্গে হিটলারের আচরণ দেখায় যে, ভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতি একসঙ্গে থাকতে পারে না। তাঁর মতে, অ-হিন্দুরা ভারতে থাকতে চাইলে হিন্দু জাতির অধীন থাকতে হবে এবং নাগরিক অধিকার দাবি করা চলবে না।
স্বাধীনতার পর গান্ধীর নেতৃত্বে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু দেশভাগের সময় পাকিস্তান মুসলিম রাষ্ট্র হওয়ায় হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ে। গান্ধী হত্যার পর আরএসএস নিষিদ্ধ হয় এবং দীর্ঘদিন আড়ালে থাকে।
১৯৭০-এর দশকে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থার সময় আরএসএস আবার সুযোগ পায়। সংগঠনের নেতাদের গ্রেপ্তার করা হলে তারা নিজেদের গণতন্ত্র রক্ষার শক্তি হিসেবে তুলে ধরে। এরপর ১৯৯০-এর দশকে অযোধ্যার বাবরি মসজিদ আন্দোলন আরএসএস ও হিন্দু রাজনীতিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।
১৯৯২ সালে উগ্র হিন্দু জনতা মসজিদটি ধ্বংস করে। এতে সংগঠনটি আবার নিষিদ্ধ হয়। কিন্তু হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ করার এই কৌশলই ভবিষ্যতে তাদের বড় শক্তি হয়ে ওঠে।
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর আরএসএস-এর এজেন্ডা দ্রুত বাস্তবায়িত হয়। অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণ হয়, কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা তুলে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে সারা দেশে সংগঠনের প্রভাব দ্বিগুণ হয়।
শতবর্ষ উদযাপনের প্রেক্ষাপটে নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, কীভাবে আরএসএস আর প্রান্তিক সংগঠন নয়—বরং রাষ্ট্রের ভাষা, ক্ষমতার কাঠামো এবং ভারতের নাগরিকত্বের ধারণাকেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে।
একশ বছর পর আরএসএস ভারতের রাজনীতি ও সমাজে এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখান থেকে তার প্রভাব এড়িয়ে যাওয়া আর সম্ভব নয়। এই পরিবর্তন দেশকে ঐক্যবদ্ধ করবে, নাকি আরও বিভক্ত করবে—এটাই ভারতের ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
